তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান ফেরার রায় বহাল
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয় পরিবর্তন করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ আজ বৃহস্পতিবার সকালে এ রায় দেন। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রইল বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
রায়ের পরপরই অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল। পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যখন রিট করা হয়, তখন হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা এবং সংবিধানে ৭ক, ৭খ বাতিলের রায় বহাল থাকল। আল্টিমেটলি (শেষ পর্যন্ত) হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল।’
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি আপিল হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি একটি এবং নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন পৃথক আপিল করেন। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার একটি আপিল করেন।
পৃথক আপিলের ওপর গত সোমবার শুনানি শুরু হয়। গত মঙ্গলবার ও গতকাল বুধবার শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন (বৃহস্পতিবার) ধার্য করেন। আপিলগুলো খারিজ করে আজ রায় দেওয়া হলো।
এর ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল রইল বলে জানিয়েছেন সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছিল।
পঞ্চদশ সংশোধনী, রিট, হাইকোর্ট ও আপিলের রায়
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সংসদে পাস হয়।
সংশোধনীতে সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছিল। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতির পাশাপাশি সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে আলাদা দুটি রিট হয়।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বাদ দেওয়াসংক্রান্ত সেই সংবিধান আইনের ২০ ও ২১ ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়। ওই দুটিসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭(ক), ৭(খ), ৪৪(২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিলও ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় গত বছরের ৮ জুলাই প্রকাশিত হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুজন সম্পাদকসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যরা পৃথক লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন।
এরপর আপিল বিভাগ গত বছরের ১৩ নভেম্বর লিভ মঞ্জুর (আপিল করার অনুমতি) করে আদেশ দেন। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি আপিল করা হয়, যা আজ খারিজ হলো।
আদালতে সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কারিশমা জাহান ও রিদুয়ানুল করিম। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির শুনানি করেন। অপর আপিলকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির।
রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ শুনানিতে ছিলেন।
এ মামলায় ইন্টারভেনার (তৃতীয় পক্ষ) হিসেবে যুক্ত গণফোরামের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন ও ইন্টারভেনার হিসেবে আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ শুনানিতে অংশ নেন।
‘তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ফিরতে বাধা থাকল না’
রায়ের পর এক ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে যে রায় হয়েছিল, সেটি বহাল রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ যে চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, সেই বিষয়গুলো অসাংবিধানিক ঘোষিত থাকবে। এ ছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যে চারটি বিষয় হাইকোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, তার মধ্যে এক নম্বর ছিল—বর্তমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(ক) ও ৭(খ)। ৭(ক) ও ৭(খ) ছিল এমন—এই সংবিধানের কতগুলো বিষয় আছে, যেগুলো পরিবর্তন করা যাবে না। যদি কেউ পরিবর্তন করে, তাহলে সেটা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহ। হাইকোর্ট বিভাগ এই অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগে এই অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক থেকে গেল। দ্বিতীয়ত, হাইকোর্ট বিভাগ গণভোটের যে বিধান ছিল, সেই গণভোটের বিধানকে পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তিত হলো। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৪(২) অনুযায়ী নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ এই রিটের ক্ষমতা প্রদানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগ এই অসাংবিধানিক ঘোষণা করার জায়গাটিকে অসাংবিধানিক রেখেছেন। অর্থাৎ হাইকোর্ট বিভাগ ছাড়া আর কোনো আদালতে রিট আবেদন করার কোনো এখতিয়ার থাকবে না।
চতুর্থ বিষয়টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল বলে উল্লেখ করেন শিশির মনির। তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ এই বাতিলটা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ যে বাতিল করেছেন, সে বিষয় বহাল থাকবে। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসতে আর কোনো বাধা থাকল না।
এ ছাড়া যেগুলো রাষ্ট্রের পলিসি, রাষ্ট্রের নীতি, যেমন সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১১, ১২ ও ২৫—এগুলোসহ যেগুলো নীতিকথা, এই নীতির বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পরিপূর্ণভাবে সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শিশির মনির। তিনি বলেন, ‘মনে করি, এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদের দায়িত্ব অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছে। অনেকাংশে জাতীয় সংসদের ওপর নির্ভর করবে। জুলাই চার্টার থেকে শুরু করে সংবিধান সংশোধন করার ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ তারা নেবে, এ চার বিষয় ছাড়া বাকি বিষয়গুলো সংসদে সামনে উন্মুক্ত থাকল।…রায়ের মর্মকথা হলো, চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। এ ছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো ছিল, জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’







