অভিভাবকের অমতে পালিয়ে বিয়ে: একটি প্রাণের অকাল মৃত্যু, দুই পরিবারের জীবনে গভীর ক্ষত
অভিভাবকের অমতে পালিয়ে বিয়ে: একটি প্রাণের অকাল মৃত্যু, দুই পরিবারের জীবনে গভীর ক্ষত
মাত্র ৯ মাস আগে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী সাইদুল। সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ছিল একটি সুন্দর সংসার গড়ে তোলার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথচলা থেমে গেল খুব অল্প সময়েই। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সম্পর্কের ভাঙন শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল একটি তরুণ প্রাণ; আর গভীর সংকটে ফেলে দিল দুটি পরিবারকে।
ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়ার এলাহি বক্স বাড়ির বাসিন্দা মো. সাদেকের ছেলে সাইদুলের সঙ্গে পরিচয় হয় একই এলাকার উত্তর চাঁদপুর জিলানী মাদ্রাসার সুপার মাওলানা মোহাম্মদ আইয়ুব আলীর মেয়ে রুকাইয়ার। একই মাদ্রাসায় পড়াশোনার সুবাদে পরিচয়, এরপর বন্ধুত্ব, তারপর প্রেম। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট বছর ধরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে দুজনেই ফেনী আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন।
প্রায় দুই মাস আগে পরিবারের সম্মতি ছাড়াই তারা পালিয়ে বিয়ে করেন। বিয়ের পর ফোনে বিষয়টি দুই পরিবারকে জানানো হয়। ছেলের পরিবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিষয়টি মেনে নিলেও মেয়ের পরিবার তা গ্রহণ করেনি।
সময়ের সঙ্গে দুই পরিবারের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়। রুকাইয়া স্বামীর বাড়িতেই ছিলেন। এদিকে চাকরির দায়িত্ব পালনের জন্য সাইদুল চলে যান ডেমরা পুলিশ লাইন্সে। সামনে পরীক্ষা থাকায় রুকাইয়া বাবার বাড়িতে গিয়ে দোয়া নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সরল বিশ্বাসে সাইদুল তাকে অনুমতি দেন।
কিন্তু বাবার বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ধীরে ধীরে সাইদুলের ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দেন রুকাইয়া। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে সাইদুল পরিবারের সদস্যদের জানান। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে রুকাইয়া জানান, আগে যার সঙ্গে তার বিয়ের কথা হয়েছিল, এখন তার সঙ্গেই বিয়ে হবে। অর্থাৎ তিনি আর সাইদুলের কাছে ফিরে যাবেন না। এর মধ্যে একবার সাইদুলের বাড়িতে এসে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে যান রুকাইয়া, যাওয়ার সময় সাইদুলকে ডিভোর্স দেয়ার কথাও জানান তিনি।
এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত সাইদুলকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। দীর্ঘ আট বছরের সম্পর্ক, তারপর বিয়ে—কিন্তু বিয়ের মাত্র দেড় মাসের মাথায় এমন বিচ্ছেদ তিনি মেনে নিতে পারেননি। চরম হতাশার এক পর্যায়ে গত ১৬ জুলাই রাতে ডেমরা পুলিশ লাইন্সে নিজের কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে বিছানার চাদর পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
একজন তরুণের জীবন অকালে ঝরে গেল। কিন্তু ক্ষতির পরিধি শুধু একজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না। শোকে ভেঙে পড়েছে সাইদুলের পরিবার। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা রুকাইয়া ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে এই ঘটনার প্রভাব রুকাইয়া ও তার পরিবারের জীবনেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করতে পারে। দুটি পরিবারই আজ মানসিক, সামাজিক ও আইনি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
এই ঘটনাটি আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। পারিবারিক অমতের মধ্যে গোপনে বিয়ে, দীর্ঘদিনের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, পারস্পরিক অবিশ্বাস, পারিবারিক সংলাপের অভাব এবং আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলেই একটি মর্মান্তিক পরিণতির জন্ম দিয়েছে।
একটি ভুল সিদ্ধান্ত কখনো কখনো শুধু একজনের জীবনই নয়, বহু মানুষের ভবিষ্যৎও বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। তাই পারিবারিক বিরোধ, সম্পর্কের সংকট বা মানসিক কষ্ট—যে কোনো পরিস্থিতিতে আবেগের বশে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়; বরং পরিবার, স্বজন বা প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াই হতে পারে জীবন রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।
তথ্য যাচাই- সিরাজুল হক টিপু, সিনিয়র রিপোর্টার।







