জাতিসংঘে একই পরিবারের তিন সদস্যের ভাষণ: জিয়াউর রহমানের পর খালেদা জিয়া, এরপর তারেক রহমান
জাতিসংঘে একই পরিবারের তিন সদস্যের ভাষণ: জিয়াউর রহমানের পর খালেদা জিয়া, এরপর তারেক রহমান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একই পরিবারের তিন সদস্যের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তাঁর স্ত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন তাঁদের ছেলে ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বক্তব্য দেন। জাতিসংঘে দেওয়া তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন, মানুষের অধিকার, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
এর আগে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে ওই অধিবেশনের তৃতীয় প্লেনারি সভায় তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। ভাষণে তিনি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
জিয়াউর রহমানের ওই ভাষণের ১৩ বছরেরও বেশি সময় পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে ওই দিনের অধিবেশনে তাঁর বক্তব্যও সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে খালেদা জিয়ার জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা শুধু ১৯৯৩ সালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জাতিসংঘের বিভিন্ন সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে তিনি পরবর্তী সময়েও বক্তব্য দেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট পাঁচটি কার্যক্রমে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক অধিবেশন, ২০০২ সালের শিশু বিষয়ক বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালের ৬০তম সাধারণ অধিবেশন-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও রয়েছে।
এরপর ৩৩ বছরের কাছাকাছি ব্যবধানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেন তাঁর ছেলে তারেক রহমান। জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্টের ভাষণ থেকে খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবরের ভাষণের ব্যবধান ১৩ বছর ৩৬ দিন। আর খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবরের ভাষণ থেকে তারেক রহমানের ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণের ব্যবধান ৩২ বছর ৩৫৮ দিন।
অর্থাৎ, ১৯৮০ থেকে ২০২৬—প্রায় ৪৬ বছরের সময়পর্বে একই পরিবারের তিন সদস্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনটি বক্তব্যের সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের ভাষণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। আর ২০২৬ সালে তারেক রহমান বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকার এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় তুলে ধরেন।
তারেক রহমান তাঁর ২০২৬ সালের ভাষণেও জাতিসংঘের এই মঞ্চে তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার বক্তব্য দেওয়ার কথা স্মরণ করেন। ভাষণের একপর্যায়ে তিনি বলেন, তাঁর বাবা ও মা এই বৈশ্বিক মঞ্চ থেকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে কথা বলেছেন এবং একইভাবে তিনিও দেশের জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
ফলে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান—একই পরিবারের তিন সদস্যের ভিন্ন তিন সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ধারাবাহিকতা হিসেবে সামনে এসেছে।







