শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৭ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
শেখ মুজিব হত্যার আগে অস্থির বাংলাদেশ: শেষ কয়েক সপ্তাহে যা ঘটেছিল গ্যাস সংকটের অজুহাতে ছাগলনাইয়ায় বেড়েছে সিএনজি ভাড়া আল্লামা সাঈদীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ এজলাসে গিয়ে বিচারকের কাছে প্রত্যাখ্যাত দাগনভূঞার প্রত্যাহারের আদেশপ্রাপ্ত ওসি নোমান বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে যোগ্য ড. ইউনূস সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়াতে পিআইবির উদ্যোগফেনীতে ৪০ সাংবাদিকের ৩ দিনেরএআই ও ফ্যাক্ট চেকিং প্রশিক্ষণ চিরকুটে সানির আকুতি—‘প্লিজ আমার বই চুরি করবেন না’ আমি কষ্ট পাই এমপির গলায় রামদা ধরে সম্পত্তির দলিল নেওয়ার অভিযোগ, আদালতে মামলা এসএসসির খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করবেন যেভাবে- ফেনীতে দিনে দুপুরে কলেজছাত্র ইয়ামিনকে হত্যা

শেখ মুজিব হত্যার আগে অস্থির বাংলাদেশ: শেষ কয়েক সপ্তাহে যা ঘটেছিল

আনোয়ার হোসাইন বিন আহমেদ / ১৩ Time View
Update : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

শেখ মুজিব হত্যার আগে অস্থির বাংলাদেশ: শেষ কয়েক সপ্তাহে যা ঘটেছিল

বিবিসি বাংলা’র বিশ্লেষণ-

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সপরিবারে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান।

তবে ১৫ আগস্টের সেই ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেনি। এর আগের কয়েক সপ্তাহে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে একাধিক সংকট তৈরি হয়েছিল। দুর্নীতি, লুটপাট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চরমপন্থীদের তৎপরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ—সব মিলিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল অস্থির পরিবেশ।

এর পাশাপাশি বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল গঠন এবং চারটি ছাড়া অন্য সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও সংকুচিত করে তোলে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, তখন দেশে ‘দম বন্ধ হওয়ার মতো’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় সেনাবাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থানের পথ বেছে নিয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।

দুর্নীতি ও লুটপাটে ক্ষোভ

স্বাধীনতার পর কয়েক বছরের মধ্যেই প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও অনিয়ম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথা এবং তৎকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উঠে আসে।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদ তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ বইয়ে লিখেছেন, ত্রাণসামগ্রীও অনেক সময় দুস্থ মানুষের কাছে পৌঁছাত না। গম, চাল ও কম্বল চুরির অভিযোগ ছিল।

দুর্নীতি, চোরাচালান ও লুটপাট নিয়ন্ত্রণে সরকার একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায়। কিন্তু অভিযান চালাতে গিয়ে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের অনেকে দেখতে পান, ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মীও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।

এ নিয়ে সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের বিরোধ তৈরি হয়। দলের নেতারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের কাছে অভিযোগও করতে থাকেন। একপর্যায়ে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, এর ফলে সেনা সদস্য ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, সরকার দলের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি বন্ধ না করে বরং তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে।

জুলাই ১৯৭৫-এর শেষদিকে সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্যশস্য লুটের ঘটনাও সংবাদপত্রে উঠে আসে। দৈনিক ইত্তেফাক ২৬ জুলাই সরকারি গুদাম থেকে খাদ্যশস্য পাচারের ছবি প্রকাশ করে। পরে আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি গুদাম থেকে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর সময় পথেই প্রায় এক-চতুর্থাংশ খাদ্যশস্য ‘রহস্যজনকভাবে উধাও’ হয়ে যাচ্ছে।

১০ আগস্ট দৈনিক বাংলার এক সম্পাদকীয়তেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির বিস্তারের কথা তুলে ধরা হয়।

আইনশৃঙ্খলার অবনতি

দুর্ভিক্ষের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যার ঘটনা ঘটছিল।

শুধু বসতবাড়ি নয়, ট্রেন ও লঞ্চেও ডাকাতির ঘটনা ঘটত। ১১ আগস্ট ১৯৭৫ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদীগামী যাত্রীবাহী ট্রেনে ডাকাতির খবর প্রকাশিত হয়।

ডাকাতদের বাধা দিতে গেলে তারা শতাধিক রাউন্ড গুলি চালায়। এতে দুই যাত্রী নিহত এবং অন্তত ২২ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান

১৯৭৫ সালের শুরুতে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার পুলিশের হাতে নিহত হওয়ার পর চরমপন্থী সংগঠনগুলোর সহিংস তৎপরতা আরও বাড়ে।

সরকারের ভাষ্য ছিল, এসব তৎপরতার কারণে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বহারা পার্টিসহ বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের বিরুদ্ধে পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর অভিযান জোরদার করা হয়।

তৎকালীন সংবাদপত্রগুলোতে এসব অভিযানে গ্রেফতার, অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে চরমপন্থীদের নিহত হওয়ার খবরও নিয়মিত প্রকাশিত হতো।

১৩ আগস্ট, অর্থাৎ শেখ মুজিব নিহত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘৪ জন চরমপন্থী নিহত, ১ জন গ্রেফতার’।

খরার পর বন্যা

দুর্ভিক্ষের ধাক্কা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই ১৯৭৫ সালে নতুন করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে বাংলাদেশ।

খাদ্য সংকট মোকাবিলায় আউশ মৌসুমে বেশি জমিতে ধান চাষের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় তীব্র খরা।

৯ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পানির অভাবে কুমিল্লা, নেত্রকোনা, কালীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার আউশ ধানের গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে।

এর কিছুদিন পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। শুরু হয় টানা বৃষ্টি। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে অতিবৃষ্টিতে সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দেয়।

বন্যায় ফসল ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কোথাও কোথাও প্রাণহানিও ঘটে। একই সঙ্গে বন্যাকবলিত এলাকায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে এবং খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হয়।

সেনাবাহিনীতে বাড়ছিল অসন্তোষ

তৎকালীন সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথায় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে।

দলীয় নেতাদের চাপের মুখে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে তরুণ কর্মকর্তাদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। একই সঙ্গে শেখ মুজিবের একদলীয় শাসনব্যবস্থা নিয়েও সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ ছিল।

এম এ হামিদের বর্ণনা অনুযায়ী, তরুণ মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের একটি অংশ তখন ক্ষুব্ধ হয়ে নিজেদের মধ্যে দল গঠন করতে শুরু করেন।

পদ-পদবি নিয়েও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। পাশাপাশি রক্ষী বাহিনীকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সেনাদের মধ্যে সন্দেহ ও অসন্তোষ তৈরি হয়।

সেনানিবাসে এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়ে যে, শেখ মুজিব সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে ভারতীয় সহযোগিতায় রক্ষী বাহিনীকে শক্তিশালী করছেন। রক্ষী বাহিনীর জন্য নতুন অস্ত্র, ব্যারাক, গাড়ি ও ইউনিফর্মের ব্যবস্থা সেনাবাহিনীর একাংশের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয় বলে এম এ হামিদ তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন।

কিছু তরুণ সেনা কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত বা জোরপূর্বক অবসরে পাঠানোর ঘটনাও অসন্তোষ বাড়িয়ে দেয়।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান

সরকারের বিরুদ্ধে জনসমর্থন কমে যাওয়ার বিষয়টি একপর্যায়ে শেখ মুজিব নিজেও উপলব্ধি করেছিলেন বলে বিশ্লেষকদের মত।

দুর্নীতি ও চোরাচালান ঠেকাতে সরকার কয়েক দফা অভিযান চালায়। এর মধ্যে শেষ দিকের একটি অভিযান শুরু হয় শেখ মুজিব নিহত হওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ আগে।

জুলাইয়ের শেষভাগে পরিচালিত এই অভিযানের বড় একটি অংশ ছিল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। তখন বিভিন্ন সংবাদপত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত ও গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হয়।

১ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সাত লাখের বেশি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতারের কথা জানানো হয়।

অভিযোগ ছিল, টিসিবির ওই তিন কর্মকর্তা ব্যাংকের ভুয়া রশিদ ব্যবহার করে সরকারি প্রায় সাত লাখ ২৭ হাজার টাকার সমপরিমাণ সিমেন্ট তুলে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন।

দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিমন্ত্রী বরখাস্ত

সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল তৎকালীন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জুরকে বরখাস্ত করা।

১৯৭৫ সালের শুরুতে তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে তাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তৎকালীন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার ও প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সতর্ক করা এবং সরকারের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

২১ জুলাই শেখ মুজিবুর রহমান নুরুল ইসলাম মঞ্জুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত জানিয়ে চিঠি দেন। পরদিন দৈনিক ইত্তেফাক সেই চিঠির বক্তব্য প্রকাশ করে।

অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা

১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মেজর সৈয়দ ফারুক রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়। তিনি ছিলেন প্রথম বেঙ্গল ল্যান্সার রেজিমেন্টের কর্মকর্তা।

বেশ কিছু সময় ধরে পরিকল্পনা করার পর ১৫ আগস্টের কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি অন্য কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এম এ হামিদের বর্ণনা অনুযায়ী, দেশের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দুর্ভিক্ষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, খুন ও হাইজ্যাকিংয়ের মতো ঘটনাগুলো মেজর ফারুককে গভীরভাবে হতাশ করেছিল।

ভারতের সঙ্গে শেখ মুজিব সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও তার মধ্যে তীব্র আপত্তি তৈরি হয়েছিল বলে হামিদের বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

মেজর ফারুক প্রথমে তার ভায়রা ভাই মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদের সঙ্গে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। ১২ আগস্ট রাতে তাদের আলোচনায় ১৫ আগস্টকে অভ্যুত্থানের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয় বলে ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

মোশতাকের সঙ্গে যোগাযোগ

অভ্যুত্থানের পরিকল্পনায় পরে যুক্ত হন চাকরিচ্যুত ও জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ছিলেন মেজর শরীফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী, আজিজ পাশা ও সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান। সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বজলুল হুদাও এতে যুক্ত হন।

পরিকল্পনাকারীরা আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। তাদের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইতিবাচক সাড়া দেন বলে এম এ হামিদের বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

২ আগস্ট মেজর রশিদ মোশতাক আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন। দুজনের বাড়িই কুমিল্লা অঞ্চলে হওয়ায় তাদের মধ্যে যোগাযোগ সহজ ছিল বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, শেখ মুজিবকে উৎখাত ও হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেবেন এবং রাজনৈতিক চাপ সামাল দেবেন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

১৪ আগস্টের শেষ রেকি

অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১৪ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসভবন ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

শেখ মুজিব হত্যা মামলার সাক্ষী সুবেদার গণি তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, ১৪ আগস্ট বিকেলে মেজর ডালিমকে মোটরসাইকেলে করে শেখ মুজিবের বাসভবনের সামনে ঘোরাফেরা করতে দেখেছিলেন।

সেদিন ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাকেও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় দেখা যায় বলে তদন্তে উঠে আসে। সেনানিবাসের টেনিস কোর্টেও মেজর ডালিমসহ কয়েকজন চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তাকে দেখা গিয়েছিল বলে এম এ হামিদ তার বইয়ে লিখেছেন।

এরপর নিয়মিত মহড়ার অজুহাতে অভ্যুত্থানকারীরা রাতে ট্যাংক, অস্ত্র ও সৈন্য নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান নেন। প্রত্যেককে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর ১৫ আগস্ট ভোরে তারা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অভিযান চালায়।

সেই অভিযানে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন।

৩২ নম্বরের চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি নিরাপত্তা

পরবর্তী গোয়েন্দা তদন্তে উঠে আসে, ১৫ আগস্ট রাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসভবনে অভ্যুত্থানকারীদের প্রতিহত করার মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সেদিন নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। কারণ ১৫ আগস্ট সকালে শেখ মুজিবের সেখানে যাওয়ার কথা ছিল এবং সে অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি নিয়েছিল।

এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। কারা ওই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে এর পর সেখানে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়।

অন্যদিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের কাছেও পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ছিল না বলে পরবর্তী তদন্তে জানা যায়।

আগস্টের আগেও শেখ মুজিবের ওপর হামলা

১৫ আগস্টের আগে শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর আরও একবার হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা যায়। তবে তৎকালীন সরকার ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতে দেয়নি।

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের একটি গোপন বার্তায় এ হামলার তথ্য ওয়াশিংটনকে জানানো হয়েছিল।

বার্তায় বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ২১ মে বিকেলে টেলিভিশন স্টেশন পরিদর্শন শেষে বাসায় ফেরার পথে শেখ মুজিবের ওপর হামলা চালানো হয়। তিনি অক্ষত থাকলেও অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তি আহত হন।

হামলার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, সে বিষয়ে মার্কিন গোপন বার্তায় কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। শেখ মুজিবের নিরাপত্তায় থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তাকে ঘটনাটি নিশ্চিত করেছিলেন।

তবে ঘটনাটি জনগণের সামনে প্রকাশ না করতে সরকারি নির্দেশ ছিল। তথ্য অধিদপ্তর হামলার খবর প্রকাশ না করার জন্য পত্রিকাগুলোর কাছেও নির্দেশনা পাঠিয়েছিল বলে ওই মার্কিন গোপন বার্তায় উল্লেখ করা হয়।

সব মিলিয়ে ১৫ আগস্টের আগের কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশ ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দুর্নীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সামরিক অসন্তোষে জর্জরিত। এর মধ্যেই গোপনে এগিয়ে চলছিল অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি, যার পরিণতি ঘটে ১৫ আগস্টের ভোরে।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি বাংলা। (পরিমার্জিত)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!