শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৪ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেন ছাগলনাইয়ার ঘোপালের কৃতি সন্তান গোলাম কিবরিয়া রিয়াদ ছাগলনাইয়ায় সড়ক দূর্ঘটনায় নি’হত ৩ জনের পরিচয় জানা গেছে দুই স্বাস্থ্যকর্মীর হাত ধরে স্বাভাবিক প্রসবে জন্ম ১০ হাজারের বেশি শিশুর বিদ্যুত বিল বেশি আসায় প্রধানমন্ত্রীকে গালিগালাজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্টের শিক্ষার্থীকে নিয়ে গেল পুলিশ ফেনীতে ‘মাই ফেনী’ অ্যাপের উদ্বোধন, জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সম্মাননা ফুলগাজীর আমজাদহাট-তহসিলদার সড়কে বেহাল দশা: ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ, দ্রুত সংস্কারের দাবি ফেনীতে র‍্যাবের অভিযানে ২১.৫ কেজি গাঁজাসহ ২ মাদক কারবারি আটক, কার্গো ট্রাক জব্দ পরকীয়ার প্রতিবাদ করায় মিথ্যা মামলার প্রধান আসামি হয়ে ফেঁসে গেলেন ফেনী কলেজের শিক্ষার্থী বাবর ছাগলনাইয়ায় বিজিবির অভিযানে ৩৬ কেজি ভারতীয় গাঁজা ও সিএনজি জব্দ এক রাতে ফেনীতে ৬০ লাখ টাকার ভারতীয় মালামাল জব্দ

দুই স্বাস্থ্যকর্মীর হাত ধরে স্বাভাবিক প্রসবে জন্ম ১০ হাজারের বেশি শিশুর

আনোয়ার হোসাইন বিন আহমেদ / ৬৯ Time View
Update : শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দুই স্বাস্থ্যকর্মীর হাত ধরে স্বাভাবিক প্রসবে জন্ম ১০ হাজারের বেশি শিশুর

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নাজমা আক্তার ও শিরিনা চৌধুরী। তাঁদের তত্ত্বাবধানে গত কয়েক দশকে স্বাভাবিক প্রসবে জন্ম নিয়েছে সাড়ে ১০ হাজারেরও বেশি শিশু।

প্রসববেদনায় কাতর মায়ের পাশে দাঁড়াতে কখনো গভীর রাতে, কখনো ভোরের আগেই ছুটে যেতে হয়েছে তাঁদের। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও আন্তরিক সেবায় প্রত্যন্ত এলাকার প্রসূতিদের কাছে তাঁরা এখন ভরসার নাম।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়াদৌলত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নাজমা আক্তার এবং বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা শিরিনা চৌধুরী এভাবেই নিজেদের কাজের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

দুই উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নাজমা আক্তার গত ১২ বছরে প্রায় ৩ হাজার এবং শিরিনা চৌধুরী ৩৪ বছরে ৭ হাজার ৫৭৩টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন।

প্রশিক্ষণের পর বাড়ে নাজমার সুনাম

বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ছয়ফুল্লাহকান্দি ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা নাজমা আক্তার ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় মাসের মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তাঁর দক্ষতা ও সুনাম আরও বাড়তে থাকে।

বর্তমানে শুধু বাঞ্ছারামপুর নয়, পাশের নবীনগর উপজেলা, নরসিংদী এবং কুমিল্লার হোমনা থেকেও প্রসূতিরা তাঁর কাছে আসেন।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ও দরিয়াদৌলত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য বলছে, গত সাড়ে পাঁচ বছরেই নাজমার তত্ত্বাবধানে স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত তাঁর তত্ত্বাবধানে ২ হাজার ৪৪১টি শিশুর স্বাভাবিক জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—মাত্র সাত মাসেই তিনি ২৮০টি স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করেছেন।

এক দিনে সর্বোচ্চ ছয়টি প্রসব করানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। গত ১৬ জুন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর কক্ষে রোগীদের ভিড়। পাশের কক্ষে প্রসববেদনা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন এক প্রসূতি। আগের দিন বিকেল থেকে পরবর্তী ১৭ ঘণ্টায় তিনি পাঁচটি স্বাভাবিক প্রসব করান।

নাজমার তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত ১৫ জোড়া যমজ শিশুর জন্ম হয়েছে।

নাজমা আক্তার বলেন, অনেক সময় টানা কাজ করতে গিয়ে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তবে একটি সুস্থ নবজাতক পৃথিবীর আলো দেখার পর সেই ক্লান্তি আর থাকে না। বর্তমানে তিনি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫টি স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করেন।

২০১৯ সালে মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণের পর তাঁর দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানুষের আস্থাও বেড়েছে বলে জানান তিনি।

স্বাভাবিক প্রসবে অবদানের জন্য ২০২২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত টানা উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হয়েছেন নাজমা। ২০২৪, ২০২৫ সালসহ চলতি বছরেও তিনি জেলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন।

৩৪ বছরে শিরিনার হাতে ৭ হাজার ৫৭৩ প্রসব

বিজয়নগরের পাহাড়পুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে শিরিনা চৌধুরী যোগ দেন ১৯৯২ সালের জুনে

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি মাসে গড়ে ৮ থেকে ৯টি এবং ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাসে ২৫ থেকে ৩০টি প্রসব করিয়েছেন। সব মিলিয়ে ৩৪ বছরে তাঁর তত্ত্বাবধানে ৭ হাজার ৫৭৩টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক মাসে ৪৭টি প্রসব করিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েন তিনি।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ২০১৯ সাল থেকে অনলাইনে প্রসবের তথ্য সংরক্ষণ শুরু করে। সেই হিসাবে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বিজয়নগরের ১০টি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে মোট ৫ হাজার ৫৫২টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। এর মধ্যে একাই শিরিনা করিয়েছেন ২ হাজার ৪৩৯টি

বর্তমানে উপজেলার ১০টি কেন্দ্রের মধ্যে চারটিতে স্বাভাবিক প্রসব হচ্ছে। বাকি ছয়টি কেন্দ্রে প্রসব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

শিরিনা চৌধুরী জানান, কর্মজীবনের শুরুর দিকে তাঁকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রসব করাতে হতো। পরে মানুষকে সচেতন করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রমুখী করা হয়। একের পর এক সফল প্রসবের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রসূতিদের আস্থাও বাড়তে থাকে।

তাঁর ভাষায়, কত নির্ঘুম রাত কেটেছে তার হিসাব নেই। তবে সুস্থভাবে যখন একটি নবজাতক পৃথিবীর আলো দেখে, তখন সেই আনন্দেই ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।

স্বাস্থ্যসেবায় অবদানের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন শিরিনা। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তিনি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হয়ে আসছেন এবং তাঁর কর্মস্থল স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিও শ্রেষ্ঠ হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কারও পান।

রোগীদের আস্থাই তাঁদের বড় অর্জন

দরিয়াদৌলত গ্রামের আনসার আলী গত ১৬ জুন তাঁর অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূকে নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন। তিনি জানান, তাঁর আরেক নাতির জন্মও এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নাজমার সুনাম এখন শুধু ইউনিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পুরো বাঞ্ছারামপুর এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকার প্রসূতিরাও তাঁর কাছে আসছেন। রোগীদের সঙ্গে তাঁর আচরণ ও সেবায় সন্তুষ্ট তাঁরা।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, শিরিনা চৌধুরী ও নাজমা আক্তার স্বাভাবিক প্রসবে জেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁরা অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন।

জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ

তবে স্বাভাবিক প্রসবের পাশাপাশি ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন নাজমা ও শিরিনা। কোনো প্রসূতির শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন মনে হলে তাঁরা দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

এ কারণে স্বাভাবিক প্রসবের সময়ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের সামনে অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)-এর সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগম বলেন, নাজমা ও শিরিনার কাজ প্রশংসনীয়। তাঁর মতে, সারা দেশে স্বাভাবিক প্রসবের এই ধারা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

দীর্ঘদিনের সেবা, হাজারো প্রসব এবং অসংখ্য পরিবারের আস্থার মধ্য দিয়ে নাজমা আক্তার ও শিরিনা চৌধুরী দেখিয়ে দিয়েছেন—দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতা থাকলে ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রও প্রসূতিসেবায় মানুষের অন্যতম নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!