ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষকে ওএসডির নেপথ্যে কি?
ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষকে ওএসডির নেপথ্যে কি?
ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ এনামুল হক খন্দকারকে সম্প্রতি ওএসডি করা হয়েছে। তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে কলেজের বিভিন্ন তহবিলে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং একাডেমিক কার্যক্রমে বেশ কিছু উদ্যোগের তথ্য সামনে আসার পর তাঁর এই প্রশাসনিক পরিবর্তনকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
কলেজের প্রকাশিত খাতওয়ারী হিসাব অনুযায়ী, অধ্যাপক এনামুল হক খন্দকার ৯ অক্টোবর ২০২৪ দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিভিন্ন তহবিলে সম্মিলিত স্থিতি ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫১ টাকা। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাবে সেই স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার ৩৪৬ টাকা।
অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কলেজের বিভিন্ন তহবিলের সম্মিলিত স্থিতি বেড়েছে ২ কোটি ৪১ লাখ ৬১ হাজার ৯৯৫ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
এক খাতেই ১,৪৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি—
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে নিরাপত্তা নৈশপ্রহরী তহবিলে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় এ খাতে ছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৯ টাকা। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী এ তহবিলের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ৭৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। দায়িত্ব গ্রহণকালীন স্থিতির তুলনায় প্রবৃদ্ধি প্রায় ১,৪৫২.৫৫ শতাংশ।
অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, অধিভুক্তি, বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা সফর, ম্যাগাজিন, লাইব্রেরি, খেলাধুলা, রোভার স্কাউটসহ আরও কয়েকটি তহবিলেও দায়িত্ব গ্রহণকালীন স্থিতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
তহবিল বৃদ্ধির পাশাপাশি দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন—
অধ্যক্ষের দায়িত্বকালীন সময়ে কলেজে বেশ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নতুন সুবিধা যুক্ত হয়েছে বলে কলেজসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছে—
অডিটোরিয়ামের আধুনিকায়ন
সোলার সিস্টেম স্থাপন
বিভিন্ন বিভাগে এসি স্থাপন
শ্রেণিকক্ষে পানির ফিল্টার স্থাপন
নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ
পুরোনো শ্রেণিকক্ষ সংস্কার
শিক্ষার্থীদের জন্য স্পোর্টস রুম তৈরি
দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ছাত্র হোস্টেল সংস্কার ও চালু
কলেজ ক্যান্টিন তৈরি
কলেজ মসজিদ সংস্কার ও মনোরম পরিবেশ নিশ্চিতকরণ
কলেজ মাঠ সংস্কার
সরকারি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরাদ্দের মাধ্যমে নিরাপত্তা বেষ্টনীর দেয়াল নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।
এসব উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য কলেজের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
একাডেমিক উন্নয়নেও ছিল নতুন উদ্যোগ—
অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি অধ্যাপক এনামুল হক খন্দকারের সময়ে একাডেমিক কার্যক্রমেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং ব্যবস্থা চালু, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী করতে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সরাসরি অবগত হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার এই উদ্যোগ কলেজের একাডেমিক ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তাহলে ওএসডির কারণ কী?
এখানেই সামনে আসছে মূল প্রশ্ন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজে শিক্ষার্থী ও কলেজসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কলেজের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী শিক্ষকগোষ্ঠী তাঁর প্রশাসনিক অবস্থানে অসন্তুষ্ট ছিল। তাদের দাবি, অধ্যক্ষ বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় দীর্ঘদিনের কিছু অনিয়মের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে তাঁদের আরও অভিযোগ, ওই গোষ্ঠী অধ্যক্ষকে অসৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এনে তাঁকে কলেজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যিনি আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধেই উল্টো দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোন প্রমান বা তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করতে পারেনি কেউ।
হিসাব কি বলছে?
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হওয়া উচিত নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব। প্রকাশিত খাতওয়ারী হিসাব অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিভিন্ন তহবিলে ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫১.০৯ টাকা। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ তা বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার ৩৪৬.০৯ টাকা।
অর্থাৎ নিট স্থিতি বৃদ্ধি: ২ কোটি ৪১ লাখ ৬১ হাজার ৯৯৫ টাকা।
প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—
অধ্যাপক এনামুল হক খন্দকারের প্রশাসনিক কঠোরতা ও আর্থিক স্বচ্ছতার নীতি কি তাঁর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল? নাকি ওএসডির পেছনে রয়েছে অন্য কোনো প্রশাসনিক কারণ?







