সর্বস্ব হারিয়ে ছেলেকে একবার কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখতে চান নুসরাত হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া মামুনের মা
সর্বস্ব হারিয়ে ছেলেকে একবার কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখতে চান নুসরাত হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া মামুনের মা
নুসরাত হত্যা মামলায় ১৩ নম্বর আসামি ছিলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এমরান হোসেন মামুন। কোথাও সম্পৃক্ততা না মিললেও তিনি হয়েছিলেন সেই মামলার আসামি। ছিলেন না এজাহারভুক্ত আসামির তালিকায়ও। এমনকি বাদীপক্ষের কেউই জানতেন না, কীভাবে এই মামলায় জড়িয়ে গেল মামুনের নাম।
অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে নিজের রক্ত দিয়ে বাচানোর চেষ্টা করেছিলেন এমরান হোসেন মামুন। যে মেয়ের জীবন বাঁচাতে নিজের শরীরের রক্ত দান করলেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই মেয়েরই হত্যা মামলায় ফাঁসির আসামি হয়ে ৭টি বছর কারাগারের কনডেম সেলে কাটাতে হলো তাকে।
মামলার ৮৬ জন সাক্ষীর কেউই আদালতে মামুনের বিপক্ষে কোনো জবানবন্দি দেননি। উল্টো আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী নুসরাতের বড় ভাই নোমানকে জেরা করলে তিনি জানান, তার দেওয়া এজাহারে এই নাম ছিল না। এমনকি মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা তার বোনকে এই মামুনই রক্ত দিয়েছিলেন। তারপরও কিসের বা কোন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামুনকে ফাঁসির রায় শুনিয়েছিল আদালত, তা আজও এক রহস্য।
৭ বছর পর উচ্চ আদালতের রায়ে অবশেষে খালাস পেলেন এমরান হোসেন মামুন। আর কদিন পরেই কারাগারের অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে এক নিষ্ঠুর পৃথিবীর মুখোমুখি হবেন তিনি। যেখানে তার জন্য ফুল-চন্দন বিছানো থাকবে না, থাকবে না পায়ের নিচের শক্ত মাটি। আগামীর প্রতিটি দিন তাকে অতিবাহিত করতে হবে অবর্ণনীয় কষ্ট আর এক নির্মম যাঁতাকলের ভেতর দিয়ে।কারণ, মামুন যা রেখে গিয়েছিলেন, তাঁর সর্বস্বের কিছুই আজ আর তারজন্য অবশিষ্ট নেই।
মাথার ওপর বটগাছের ছায়ার মতো আঁকড়ে থাকা বাবা একমাত্র ছেলের শোকে অসুস্থ হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। বাবার মৃত্যুতেও প্যারোলে মুক্তি পাননি মামুন। শেষবারের মতো নিজের বাবার মুখটা দেখার সুযোগটুকুও তাকে দেয়নি এই বিচারব্যবস্থা।
কারাগারে যাওয়ার কিছুদিন আগেও বাপ-ছেলে মিলে একটি নতুন ঘর তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন। জায়গা নির্বাচনও করা হয়েছিল, যেখানে উঠবে তাদের স্বপ্নের নীড়। সে ঘর আর ওঠেনি, সে জায়গাও আর অবশিষ্ট নেই। মামুনের মামলার খরচ জোগাতে বিক্রি করে দিতে হয়েছে সহায়-সম্বল সবকিছু।
কীসের আশায় জেল থেকে বের হবেন মামুন? রাষ্ট্র কি রেখেছে তার জন্য? এই নিষ্ঠুর সমাজ তার অনাগত প্রতিটি দিনকেই যেন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
এদিকে একমাত্র ছেলে আর স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মামুনের মা নুরের নাহার। ছেলের মামলা চালাতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন; খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটিয়েছেন এই অভাগী মা। কবে শেষবার ভালো-মন্দ রান্না করে খেয়েছেন, তা যেন ভুলেই গেছেন। ছেলের মামলার টাকা জোগাড় করতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। জানা গেছে, আপিল শুনানিতে মামুনের আইনজীবীকে পর্যাপ্ত ফি পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি। কথা রয়েছে, জেল থেকে বের হয়ে মামুন নিজেই পরিশোধ করবেন সেই বকেয়া।
ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ এই জননীর শেষ ইচ্ছা— ছেলেকে একবার কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখবেন। মৃত্যুর আগে ছেলের হাতে অন্তত এক চুমুক পানি পান করবেন।
কিন্তু এই কঠিন আর নিষ্ঠুর সমাজে মামুনের ফিরে আসার প্রাপ্তি কী? কীভাবে অনাগত দিনগুলো মোকাবিলা করবেন তিনি? মাকে জড়িয়ে ধরা আর বন্ধুদের সঙ্গে গলা মেলানোর লোভে কাতর মামুন হয়তো এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না, কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটবে তার আগামীর দিনগুলো।
কেন এই জুলুমের শিকার হলেন মামুন? রাষ্ট্র কি মামুনের সাথে হওয়া এই অন্যায়ের কোনো প্রতিকার দিতে পারবে? নাকি এক দুর্বিষহ ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকেই তাকে একাকী হেঁটে যেতে হবে?







