দেশমাতৃকার বীর সেনানী সুবেদার জয়নাল আবেদীনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ
দেশমাতৃকার বীর সেনানী সুবেদার জয়নাল আবেদীনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ
মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের এই বীর সেনানী দীর্ঘ সামরিক জীবনে রেখেছেন গৌরবময় অবদান
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশের অহংকার। তাঁদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় হয়ে থাকে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের (সাবেক ২য় ইস্ট বেঙ্গল) গর্বিত সদস্য এবং অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার (সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার) বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১০ আগস্ট।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন (Ex-RNo-26840) ফেনী জেলার সদর উপজেলার ৫ নম্বর কাজীবাগ ইউনিয়নের পূর্ব সোনাপুর গ্রামের (ডাকঘর: ফকিরহাট) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
২০২৪ সালের ১০ আগস্ট দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে নিজ গ্রাম পূর্ব সোনাপুরে পারিবারিক গোরস্থানে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনারের মাধ্যমে তাঁর দাফন সম্পন্ন করা হয়।
জন্ম ও সামরিক জীবনের সূচনা
বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন ১৯৪৩ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। দেশ ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৬১ সালে তিনি তৎকালীন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি একজন সুশৃঙ্খল, সাহসী, দক্ষ ও দায়িত্বশীল সেনাসদস্য হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। বাংলা, ইংরেজি ও উর্দুসহ একাধিক ভাষায়ও তিনি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন নির্ভীক সৈনিক হিসেবে জয়নাল আবেদীন ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সরাসরি রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করেন এবং সাহসিকতার পরিচয় দেন।
এরপর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হয়ে তিনি বিভিন্ন রণাঙ্গনে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন মেজর কে. এম. সফিউল্লাহ, যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে এই সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন মেজর এ. এন. এম. নুরুজ্জামান। ৩ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন এলাকায় তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, হোসেনপুর, ময়মনসিংহের অংশবিশেষ, ঢাকা জেলার অংশ এবং সিলেট জেলার কিছু অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই রণাঙ্গনে জয়নাল আবেদীনের সাহসিকতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর গৌরবময় সামরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
সামরিক জীবনে পদোন্নতি ও সম্মাননা
দীর্ঘ ও সুশৃঙ্খল সামরিক চাকরি, দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ জয়নাল আবেদীন পদোন্নতি পেয়ে অনায়ুক্ত কর্মকর্তা শ্রেণির সর্বোচ্চ পদ সুবেদার (সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক জীবনে তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামরিক পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হন। এর মধ্যে রয়েছে—
- বীর মুক্তিযোদ্ধা পদক (Samar Padak/Freedom Fighter Medal)
- সংগ্রাম পদক (Sangram Medal)
- সংবিধান পদক (Constitution Medal—1972)
- জয় পদক (Joy Medal)
- রণতারকা (War Star/Sitara-e-Harb—1965)
- তমগা-ই-জং (Tamgha-e-Jang—1965)
- সেনা গৌরব পদক ও বিভিন্ন সার্ভিস মেডেল
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবন শেষে তিনি সুবেদার (সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার) পদে থেকেই সম্মানের সঙ্গে অবসর গ্রহণ করেন।
পরিবার ও স্বজনদের দোয়ার আবেদন
মৃত্যুকালে জয়নাল আবেদীন স্ত্রী, পাঁচ পুত্র, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহযোদ্ধা ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তাঁর বীরত্ব, দেশপ্রেম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের কথা স্মরণ করে পরিবারের পক্ষ থেকে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় সর্বস্তরের মানুষের কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস আগামী প্রজন্ম যেন পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ ও লালন করে—এটাই পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা।
দেশমাতৃকার এই বীর সেনানীর স্মৃতি ও অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকুক।







