বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে যোগ্য ড. ইউনূস সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়াতে পিআইবির উদ্যোগফেনীতে ৪০ সাংবাদিকের ৩ দিনেরএআই ও ফ্যাক্ট চেকিং প্রশিক্ষণ চিরকুটে সানির আকুতি—‘প্লিজ আমার বই চুরি করবেন না’ আমি কষ্ট পাই এমপির গলায় রামদা ধরে সম্পত্তির দলিল নেওয়ার অভিযোগ, আদালতে মামলা এসএসসির খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করবেন যেভাবে- ফেনীতে দিনে দুপুরে কলেজছাত্র ইয়ামিনকে হত্যা ম্যানেজিং কমিটির হাতে যাচ্ছে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং– এর নতুন রেকর্ড।  দেশমাতৃকার বীর সেনানী সুবেদার জয়নাল আবেদীনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ পিলখানা হত্যা মামলায় ১৭ বছর কারাবন্দি, জামিনে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন পলাশ

বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে যোগ্য ড. ইউনূস

আনোয়ার হোসাইন বিন আহমেদ / ৯ Time View
Update : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

রাষ্ট্রপতি পদকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, জাতীয় স্বার্থ ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভবিষ্যৎ

মতামতঃ আনোয়ার হোসাইন বিন আহমেদ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতি পদটি আবারও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই ২০২৬ স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করার পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ভারসাম্য, জাতীয় ঐক্য, পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠেছে।

এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করেছে এবং বিএনপি থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম বিবেচনায় রয়েছে—এমন রাজনৈতিক আলোচনা রয়েছে; তবে ১২ আগস্ট পর্যন্ত এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি বা দলীয় ঘোষণা পাওয়া যায়নি। বরং মির্জা ফখরুল নিজেই বলেছেন, রাষ্ট্রপতি দলীয় নাকি বাইরের কেউ হবেন, তা দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম ঠিক করবে।

অতএব, ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টি এখনো সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিকল্প, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।


রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না; জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। একই অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর দফা অনুযায়ী অধিকাংশ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।

অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি পদটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় কাঠামোয় এটি নির্বাহী সরকারের সমান্তরাল কোনো ক্ষমতাকেন্দ্র নয়।

তবু রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে কাজ করেন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।

এই জায়গাতেই ড. ইউনূসের সম্ভাব্য প্রার্থিতা আলাদা তাৎপর্য তৈরি করতে পারে।


কেন ড. ইউনূস এত গুরুত্বপূর্ণ?

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি। ২০০৬ সালে তিনি ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল কমিটির ভাষায়, দারিদ্র্যবিরোধী সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে তৃণমূল পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়ার কাজের স্বীকৃতিতেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

এর ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বিশেষ প্রতীকী মূল্য তৈরি করতে পারে।

একজন সাবেক সরকারপ্রধান বা দলীয় রাজনীতিক রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ই আন্তর্জাতিক আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। বিপরীতে ড. ইউনূসের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে—

  • নোবেল শান্তি পুরস্কার;
  • ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার বৈশ্বিক পরিচিতি;
  • আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-অঙ্গনে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ;
  • পশ্চিমা বিশ্ব ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে পরিচিত মুখ;
  • বাংলাদেশের বাইরে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক।

এই কারণে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি soft-power asset বা নরম শক্তির সম্পদ হিসেবে কাজ করতে পারে—এটি যুক্তিসঙ্গত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। তবে এটিকে এমনভাবে বলা ঠিক হবে না যে শুধু নোবেল পুরস্কারের কারণে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য অনেক বেশি জটিল।


ইউনূস সরকারের অভিজ্ঞতা: সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। প্রায় দেড় বছর পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিলুপ্ত হয়।

তাঁর সরকারের একটি বড় অর্জন ছিল নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক রূপান্তর সম্পন্ন করা। পাশাপাশি অর্থনীতি ও আর্থিক খাত স্থিতিশীল করার কিছু উদ্যোগ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বীকার করেছে।

আইএমএফের ২০২৫ সালের Article IV মূল্যায়নে বলা হয়, অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি স্থিতিশীল করার এবং নির্বাচনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা চালিয়েছে। একই সঙ্গে আইএমএফ দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের ঘাটতিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।


ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: এখানেই ইউনূসের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গত কয়েক বছরে অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টেও শেখ হাসিনার ভারত থেকে প্রকাশ্য বক্তব্য বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।

অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছে। ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তারেক রহমান ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি “conducive environment” তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়:

বাংলাদেশের স্বার্থ ভারতবিরোধী হওয়া নয়; বরং ভারতসহ সব শক্তির সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা।

এই জায়গায় ড. ইউনূসের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিত্বের একটি কূটনৈতিক সুবিধা থাকতে পারে। তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি সরকারকে একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দিতে পারে। ভারতের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও তিনি যদি রাষ্ট্রপতি হিসেবে সম্পর্ককে সংঘাতের বদলে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে পরিচালনার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে সেটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।


বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি হবে—

শক্তিশালী অর্থনীতি + কার্যকর কূটনীতি + বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক + জাতীয় ঐক্য + শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।

ড. ইউনূস এই সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই বহুমেরুকেন্দ্রিক হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতি হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে multi-vector foreign policy অনুসরণ করা।

এই নীতিতে—

  • ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক;
  • চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বাণিজ্য;
  • যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সম্পর্ক;
  • ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি ও মানবাধিকারভিত্তিক সহযোগিতা;
  • জাপানের সঙ্গে অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সহযোগিতা;
  • মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ—

সবগুলোকে একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

এই বহুমাত্রিক কূটনীতিতে ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে।


ড. ইউনূসের শক্তি মূলত—

আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নোবেল পরিচিতি, অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক।

সুতরাং প্রার্থীর প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তি নির্বাচন নয়; এটি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতীক বাংলাদেশ চায়, সেই প্রশ্নও।


শেষ কথা: ‘বিশেষ সুবিধা’

ড. ইউনূসকে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি করার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো তাঁর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য soft-power সুবিধা

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, প্রত্যর্পণ প্রশ্ন এবং একই সময়ে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা—সব মিলিয়ে আগামী রাষ্ট্রপতির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় ড. ইউনূস রাষ্ট্রপতি হলে বাংলাদেশের সামনে একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সুবিধা তৈরি হতে পারে: রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী, পরিচিত ও মর্যাদাপূর্ণ মুখ হতে পারেন।

ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাংলাদেশকে বাড়তি কূটনৈতিক শক্তি দিতে পারে; বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল ভিত্তি হবে জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।

সুতরাং রাজনৈতিক ভাষায় যদি বলা হয়—“বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ড. ইউনূসের বিকল্প নেই”,

“বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ড. ইউনূস বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সক্ষমতার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত সম্পদ হতে পারে।”

এটাই ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বাস্তবসম্মত যুক্তি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!