মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৪ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
জুলাই গণহত্যা মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড প্রয়াত যুবদল নেতার পরিবারের পাশে এমপি রফিকুল আলম মজনু, তুলে দিলেন অনুদান ফেনীতে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত ৫শ শিক্ষার্থীকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংবর্ধনা দাগনভূঞায় কৃতি শিক্ষার্থী ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত ফেনী পলিটেকনিকে বহুতল ছাত্রাবাস নির্মাণের দাবিতে সংসদ সদস্যকে স্মারকলিপি ফেনী শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে স্বরূপের আয়োজনে ‘ইশকে মুহাম্মদ’ ও কাওয়ালী সন্ধ্যা ফেনীতে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত ৫শ শিক্ষার্থীকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংবর্ধনা ফুলগাজীতে ২৭০ ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ১০ পুরোহিতকে সম্মানি দেবেন প্রধানমন্ত্রী এসএসসির মূল ফলাফলে ফেল, পুনর্নিরীক্ষণে জিপিএ-৫ পেলেন সোনাগাজীর মেধাবী শিক্ষার্থী আসাদ ফেনীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই, চলতি বছর আক্রান্ত ৩৫০

জুলাই গণহত্যা মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

আনোয়ার হোসাইন বিন আহমেদ / ১৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জুলাই গণহত্যা মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই আন্দোলন ঘিরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের পরিবারের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যারা

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির মধ্যে রয়েছেন—

  • আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের
  • আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম
  • সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত
  • যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ
  • যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল
  • ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন
  • ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ও প্রমাণ

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীমের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামিদের বিরুদ্ধে ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন কথোপকথনের অডিও রেকর্ড, সেসবের ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য সহায়ক প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এসব সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।

এর আগে ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ

যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষে সিনিয়র প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে আন্দোলনকারীদের হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ বিষয়ে মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও-ভিডিওতে প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। ওই নির্দেশের পর সারা দেশে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয় বলেও দাবি করা হয়।

আসামিপক্ষের বক্তব্য

ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী এম হাসান ইমাম রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের বিরোধিতা করেন।

তিনি বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তার তিন মক্কেল কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না। কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ক্ষেত্রে তিনি শুধু শেখ হাসিনাকে দায়ী করেন।

আইনজীবীর দাবি, তার মক্কেলরা কাউকে হত্যা করেননি এবং হত্যার কোনো নির্দেশও দেননি।

ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের পক্ষে যুক্তি

ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম আসেনি।

তার দাবি, অন্যরা আন্দোলন দমনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়েছেন—রাষ্ট্রপক্ষের এমন বক্তব্যও নাকচ করেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা চলায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

এ ছাড়া নারীদের আহত হওয়ার কথা বলা হলেও মামলায় কোনো নারী সাক্ষী আনা হয়নি বলেও যুক্তি দেন তিনি। সাক্ষ্যপ্রমাণেও এ বিষয়ে যথেষ্ট কিছু পাওয়া যায়নি দাবি করে চার আসামির খালাস চান আইনজীবী।

রাষ্ট্রপক্ষের পাল্টা যুক্তি

আসামিপক্ষের যুক্তির জবাবে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর নীতি প্রযোজ্য। একই উদ্দেশ্যে একটি গোষ্ঠী অপরাধ সংঘটন করলে সরাসরি অপরাধে অংশ না নিলেও ওই গোষ্ঠীর সদস্যরা দায়ী হতে পারেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, প্রথমে ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে নির্দেশ দেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। পরে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালানো হয়।

প্রসিকিউটর আরও বলেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কথোপকথন হয়েছে। এসব কথোপকথনে যুবলীগকে মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করেন তিনি। কথোপকথনের অডিও ট্রাইব্যুনালেও শোনানো হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আরও দাবি, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে মাঠে থেকে হামলার দিকনির্দেশনা দিতে দেখা গেছে।

তামীমের ভাষ্য, ব্যাপক হামলা চালালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে পারে—এটি জেনেও ওবায়দুল কাদের হামলার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে আসামিদের অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ শাস্তি চান তিনি।

যেভাবে এগিয়েছে মামলাটি

মামলাটি প্রথমে ৫/২০২৫ নম্বর মিস কেস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত বছরের ১৮ জুন তদন্ত শুরু করে। ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ৯টি অভিযোগ আনা হয়।

একই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় এবং একই দিন শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে।

২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর ৪ আগস্ট শুরু হয় যুক্তিতর্ক। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয় ১৭ আগস্ট। ওই দিনই মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

এরপর ট্রাইব্যুনাল-২-এর রায়ে জুলাই আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। পাশাপাশি তাদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শহীদ ও আহতদের পরিবারের মধ্যে বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!