ফেনীর খেজুর চত্বরে বিজ্ঞাপন: ঐতিহ্য ও সংকট
ফেনীর খেজুর চত্বরে বিজ্ঞাপন: ঐতিহ্য ও সংকট
ফেনী শহরের ঐতিহ্য ও পরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘খেজুর চত্বর’ এর নাম। ফেনী পৌরসভার সৌন্দর্যবর্ধন ও ট্রাফিক চত্বর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত কৃত্রিম খেজুর গাছের ভাস্কর্যটি সময়ের পরিক্রমায় ‘খেজুর চত্বর’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ফেনী শহরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষের কাছে এটি এখন একটি পরিচিত স্থান ও শহরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপনা।
সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক ও ট্রাংক রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই চত্বরটি যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক প্রচারণা ও যত্রতত্র ব্যানার-ফেস্টুন টাঙানোর প্রবণতা চত্বরটির সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেনী ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নামিদামি প্রতিষ্ঠান নিজেদের পণ্য ও সেবার প্রচারে খেজুর চত্বরকে ব্যবহার করে আসছে। সহজে মানুষের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে এখানে ব্যানার ও ফেস্টুন টাঙিয়ে রাখে। কিন্তু এসব প্রচারণাসামগ্রী স্থাপনের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি ও নান্দনিকতার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় চত্বরটির সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও ব্যানার-ফেস্টুনের কারণে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
সম্প্রতি খেজুর চত্বরে কেএফসির ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে কেএফসি কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে নেয়। এ ঘটনা আবারও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন; শহরের সৌন্দর্য ও জনস্বার্থকে উপেক্ষা করে যেকোনো প্রতিষ্ঠান কি ইচ্ছেমতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও মোড়কে বাণিজ্যিক প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে?
বাস্তবতা হলো, সমস্যাটি শুধু খেজুর চত্বরেই সীমাবদ্ধ নয়। ফেনী শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সড়কের পাশ ও ডিভাইডারে অহরহ ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলতে দেখা যায়। এসব প্রচারণাসামগ্রী শহরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে সড়কের ডিভাইডারে লাগানো গাছের সঙ্গে ব্যানার বাঁধা, গাছের ডালপালা ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করার মতো কর্মকাণ্ড পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে, সড়কের পাশে ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অপরিকল্পিতভাবে ব্যানার-ফেস্টুন স্থাপন চালক ও পথচারীদের মনোযোগ বিঘ্নিত করতে পারে। ফলে তৈরি হতে পারে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। তাই বিষয়টিকে কেবল শহরের সৌন্দর্যহানির সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি পরিবেশ সুরক্ষা, নিরাপদ সড়ক এবং সুশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এ অবস্থায় ফেনী শহরের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। অনুমোদন ছাড়া যত্রতত্র ব্যানার-ফেস্টুন টাঙানো বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে কোথায়, কীভাবে এবং কত দিনের জন্য প্রচারণাসামগ্রী স্থাপন করা যাবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনদাতাদেরও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রচারণা চালানোর অধিকার থাকলেও তা যেন জনস্বার্থ, পরিবেশ ও নগরের নান্দনিকতার পরিপন্থী না হয়, সে বিষয়ে প্রত্যেকের সচেতন থাকা জরুরি।
খেজুর চত্বর কেবল একটি মোড় নয়; এটি ফেনী শহরের পরিচিতি ও সৌন্দর্যের অংশ। তাই সাময়িক বাণিজ্যিক প্রচারণার স্বার্থে এই ঐতিহ্যকে ম্লান হতে দেওয়া উচিত নয়। পরিকল্পিত নগরায়ণ, দায়িত্বশীল প্রচারণা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকির মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নান্দনিক ফেনী শহর।







